পানি পান করার সুন্নত কয়টি ও কী কী?
গরমের দিনে স্কুল থেকে ফিরে গলা শুকিয়ে কাঠ, বা খেলাধুলার পর হাঁপাতে হাঁপাতে পানি খেতে ইচ্ছে করে এই মুহূর্তে আমরা সাধারণত শুধু “পানি”টাই দেখি, “পদ্ধতি”টা দেখি না। কিন্তু ইসলামে ছোট ছোট কাজও সুন্দরভাবে করার শিক্ষা আছে, আর পানি পান করা তার অন্যতম। পানি তো শুধু তৃষ্ণা মেটায় না, এটা শরীরকে বাঁচিয়ে রাখে আর ঠিকভাবে পান করলে শৃঙ্খলা, পরিচ্ছন্নতা, কৃতজ্ঞতা সব একসাথে শেখায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) পানি পান করার কিছু আদব ও সুন্নত শিখিয়েছেন, যাতে কাজটা শুধু অভ্যাস না থেকে ইবাদতের মতো সাওয়াবের কাজও হয়ে যায়। তাই “পানি পান করার সুন্নত কয়টি ও কী কী” এটা জানা বাস্তব জীবনের খুবই দরকারি একটা জ্ঞান।
পানি পান করার সুন্নত মোট কয়টি?
সুন্নত মানে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কথা, কাজ, বা কোনো কাজ দেখে সম্মতি দেওয়া যা অনুসরণ করলে সাওয়াব হয়। পানি পান করার ক্ষেত্রে সুন্নতগুলো অনেক সময় “আদব” হিসেবেও বলা হয়। সহজভাবে শেখানোর জন্য পানি পান করার সুন্নতকে সাধারণত ৮টি ধরা হয়। আলেমদের বইয়ে “আদব” যোগ হলে সংখ্যা কিছুটা কম-বেশি দেখা যায়, কিন্তু দৈনন্দিন জীবনে মেনে চলার জন্য এই ৮টিই সবচেয়ে পরিচিত ও দরকারি।
এর কারণটা খুব সহজ। পানি পান করার বিষয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শেখানো কিছু নিয়ম আছে। কিছু বিষয় একেবারে স্পষ্টভাবে সুন্নত হিসেবে বর্ণিত, আর কিছু বিষয়কে আলেমরা “আদব” বা ভালো ভদ্রতা হিসেবে একসাথে যোগ করেছেন। যেমন বসে পান করা, ডান হাতে পান করা, বিসমিল্লাহ বলা, এগুলো খুব পরিচিত সুন্নত। আবার পাত্রে শ্বাস না ফেলা, পানিতে ফুঁ না দেওয়া এগুলো অনেক সময় স্বাস্থ্য ও শালীনতার দিক থেকে “আদব” হিসেবেও বলা হয়। তাই কেউ যদি শুধু মূল সুন্নতগুলো গুনে, সংখ্যা কম হবে; আর কেউ যদি সুন্নত + আদব একসাথে ধরে, সংখ্যা বেশি দেখাবে।
আরেকটা বিষয় হলো সব সুন্নত সব সময় একইভাবে মানা সম্ভব হয় না। আপনি বাড়িতে থাকলে বসে ধীরে তিন শ্বাসে পানি পান করা সহজ। কিন্তু স্কুলে, ভিড়ের জায়গায়, বা দাঁড়িয়ে লাইনে থাকতে হলে বসা সম্ভব নাও হতে পারে। তখন আলেমরা বলেন, সুযোগ থাকলে সুন্নতভাবে করবেন, আর না থাকলে অন্তত যেগুলো সম্ভব যেমন বিসমিল্লাহ বলা, ডান হাতে পান করা, ধীরে পান করা এসব মেনে চলবেন।
তাই “কয়টি” নিয়ে বেশি চিন্তা না করে মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত এই ৮টি বিষয়ের মধ্যে যত বেশি সম্ভব অভ্যাস করে ফেলা। কারণ সুন্নত মানা মানে চাপ নয়; বরং দৈনন্দিন জীবনের একটা সাধারণ কাজকে সুন্দর, ভদ্র, পরিষ্কার এবং সাওয়াবের কাজে পরিণত করা।
১) বিসমিল্লাহ বলে শুরু করা
পানি খাওয়ার আগে “বিসমিল্লাহ” বলা হলো প্রথম সুন্নত। এটা শুধু মুখে একটা কথা নয় এর ভেতরে আছে একটা মানসিক শিক্ষা: আমি যা করছি, আল্লাহর নামে করছি। বাস্তবে আপনি দেখবেন, যারা বিসমিল্লাহ বলে শুরু করে, তারা তাড়াহুড়াও একটু কম করে। স্কুলে বা বাইরে পানির বতল হাতে নিলেই অনেক সময় মাথা কাজ করে না, কিন্তু বিসমিল্লাহ মনে করলেই এক মুহূর্ত থেমে যায়, আর সেই থামাটাই আদব তৈরি করে। ছোটদের শেখানোর ক্ষেত্রেও এটা খুব কার্যকর কারণ একটা শব্দ দিয়েই তাদের মধ্যে নিয়ম-শৃঙ্খলা গড়ে ওঠে। তাই পানি পান করার আগে বিসমিল্লাহ বলা যত ছোট কাজ মনে হয়, আসলে এটা অনেক বড় সুন্নতি অভ্যাস।
২) ডান হাতে পানি পান করা
ডান হাতে পানি পান করা সুন্নত। ইসলামে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও শালীনতার সাথে কিছু কাজের ভদ্র নিয়ম শেখানো হয়েছে, আর ডান হাত দিয়ে পান করা সেগুলোর অংশ। বাস্তবে আমরা অনেক সময় বাম হাতে বোতল ধরি কারণ ডান হাতে অন্য কিছু থাকে, বা অভ্যাস হয়ে গেছে। কিন্তু চেষ্টা করলে ধীরে ধীরে ঠিক হয়ে যায়। ডান হাতে গ্লাস ধরলে আপনি নিজের মধ্যে একটা নিয়ম ধরে রাখতে শিখবেন। আর শারীরিক দিক থেকেও অনেকের জন্য সুবিধা হয় কারণ বেশিরভাগ মানুষ ডান হাতেই বেশি কন্ট্রোল পায়, ফলে পান করাও হয় বেশি সাবধানে। তাই এটা শুধু “ধর্মীয় নিয়ম” নয়, দৈনন্দিন শৃঙ্খলারও একটা সুন্দর অনুশীলন।
৩) বসে পানি পান করা
সুযোগ থাকলে বসে পানি পান করা উত্তম সুন্নত। বসে পান করলে শরীর শান্ত থাকে, তাড়াহুড়া কম হয়, পান করাও হয় নিয়ন্ত্রিতভাবে। বাস্তবে আপনি দেখবেন, দাঁড়িয়ে দ্রুত পানি খেলে অনেক সময় পানি “ভুল পথে” চলে গিয়ে কাশি আসে, বা গলা আটকে যায়। বসে পান করলে সেই ঝামেলা কমে। স্কুলে টিফিন টাইমে বা মাঠে খেলাধুলার পর আপনি যদি ৩০ সেকেন্ড বসে পানি পান করেন, সেটা শরীরের জন্যও আরামদায়ক। তবে সব জায়গায় বসার সুযোগ থাকে না—তখন দাঁড়িয়ে পান করতে হলেও সমস্যা নেই, কিন্তু অভ্যাস হিসেবে বসে পান করাটাই সবচেয়ে সুন্দর ও সুন্নতের কাছাকাছি।
৪) তিন শ্বাসে ধীরে ধীরে পানি পান করা
একবারে গিলে না খেয়ে তিন শ্বাসে ধীরে ধীরে পানি পান করা সুন্নতি আদব। এর মানে হলো আপনি একটু পান করবেন, তারপর গ্লাস নামিয়ে শ্বাস নেবেন, তারপর আবার পান করবেন এভাবে তিনবার। এতে গলা, বুক আর পেট আরাম পায়। বাস্তবে যারা দৌড়ের পর বা খেলার পর একবারে অনেক পানি খেয়ে ফেলে, তাদের অনেক সময় পেট ভার লাগে, হেঁচকি ওঠে, বা অস্বস্তি হয়। তিন শ্বাসে খেলে এই সমস্যাগুলো অনেক কমে যায়। আর একটা সুবিধা হলো আপনি আপনার তৃষ্ণা বোঝার সুযোগ পান; সত্যিই কতটা দরকার, সেটা বুঝে অতিরিক্ত পানও হয়ে যায় না। তাই এই সুন্নতটা স্বাস্থ্য ও আদব দুই দিক থেকেই খুব উপকারী।
৫) পাত্রে শ্বাস না ফেলা
পানি পান করার সময় গ্লাস/কাপে মুখ লাগিয়ে ভেতরে শ্বাস ফেলা ঠিক নয়। এটা আদবেরও বিরুদ্ধে, স্বাস্থ্যগত দিক থেকেও ভালো নয়। কারণ শ্বাসের সাথে মুখের ভেতরের সামান্য থুথুর কণা বা দুর্গন্ধ পানিতে মিশে যেতে পারে। একা হলে হয়তো আপনি গুরুত্ব দেবেন না, কিন্তু একই জগ/বোতল যদি পরিবারের বা বন্ধুদের সাথে শেয়ার করা হয়, তাহলে এটা অন্যদের জন্য অস্বস্তিকর ও ক্ষতিকরও হতে পারে। বাস্তবে স্কুলে অনেকেই এক বোতল শেয়ার করে সেখানে এই আদবটা মানা খুব দরকার। অভ্যাস করার সহজ উপায় হলো: পান করার মাঝে গ্লাস একটু নামিয়ে শ্বাস নিন, গ্লাসের ভেতরে মুখ রেখে শ্বাস ছাড়বেন না।
৬) পানিতে ফুঁ না দেওয়া
অনেকে পানি বেশি গরম বা বেশি ঠান্ডা লাগলে ফুঁ দিয়ে খায়। কিন্তু পানিতে ফুঁ না দেওয়া উত্তম আদব। কারণ ফুঁ দিলে থুথুর কণা পানিতে মিশে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। আবার শেয়ার করা পানীয় হলে এটা আরও বেশি অস্বাস্থ্যকর হয়ে যায়। বাস্তবে গরম পানি হলে আপনি কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে পারেন, বা একটু ঠান্ডা পানি মিশিয়ে নিতে পারেন—এতে ফুঁ দেওয়ার দরকার পড়ে না। ঠান্ডা লাগলে ছোট ছোট চুমুক দিয়ে ধীরে ধীরে খেতে পারেন। এই সুন্নতটা মানলে পানীয় পরিষ্কার থাকে, আর মানুষের সামনে পান করার ভদ্রতাও বজায় থাকে।
৭) পানি পান শেষে আলহামদুলিল্লাহ বলা
পানি পান করার পরে “আলহামদুলিল্লাহ” বলা সুন্নত। এটা কৃতজ্ঞতার ভাষা। আমরা অনেক সময় পানি পেয়ে যাই সহজে বলে এর মূল্য বুঝি না। কিন্তু পানি না থাকলে শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে, মাথা ঘোরে, মনোযোগ কমে যায় তখন পানি যে কত বড় নিয়ামত, সেটা টের পাওয়া যায়। আলহামদুলিল্লাহ বললে মনে থাকে আমি আল্লাহর দেওয়া নিয়ামত ব্যবহার করলাম। বাস্তবে এই ছোট অভ্যাসটা মানুষের মনকে শান্ত করে, অভিযোগ কমায়, আর ভালো অনুভূতি বাড়ায়। বিশেষ করে ছোটদের জন্য এটা চরিত্র গড়ার একটা দারুণ ট্রেনিং পানির মতো ছোট জিনিসের জন্য কৃতজ্ঞ হলে বড় নিয়ামতের জন্যও কৃতজ্ঞ হতে শেখে।
৮) তাড়াহুড়া করে একবারে বেশি না খাওয়া, পরিমাণমতো খাওয়া
পানি পান করার সময় তাড়াহুড়া করে একদম বেশি একবারে খেয়ে ফেলা ঠিক না। সুন্নতির মূল শিক্ষা হলো শান্তভাবে, আদব রেখে, প্রয়োজন অনুযায়ী পান করা। বাস্তবে আপনি যদি খুব তৃষ্ণার্ত হন, তখন একবারে বেশি পানি খেলেই মনে হয় তৃষ্ণা মিটবে, কিন্তু পরে পেট ভার লাগতে পারে। তিন শ্বাসে ধীরে পান করলে পরিমাণ ঠিক থাকে। আর পানির সাথে শরীরের সম্পর্কও সুন্দর হয় আপনি বুঝতে শিখবেন কখন শরীর পানি চাইছে। তাই এই সুন্নতটা আসলে আপনার দৈনন্দিন পান করার অভ্যাসকে “শৃঙ্খলাপূর্ণ” করে তোলে।
আপনি চাইলে আমি এগুলো আরও এক ধাপ ডিটেইলসে “সঠিক পদ্ধতি”সহ লিখে দিতে পারি যেমন ১ মিনিটের মধ্যে কীভাবে সুন্নত অনুযায়ী পানি পান করবেন, বাস্তবে কোথায় ভুল হয়, আর কীভাবে অভ্যাস করবেন।
FAQs
১) পানি পান করার সুন্নত কয়টি?
একটা নির্দিষ্ট সংখ্যা সবাই একইভাবে বলে না। সাধারণভাবে গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত ও আদব মিলিয়ে ৮-১০টি বিষয় বেশি বলা হয়।
২) পানি পান করার আগে কী বলা সুন্নত?
“বিসমিল্লাহ” বলা সুন্নত। এতে কাজটা আল্লাহর নামে শুরু হয়।
৩) ডান হাতে পানি পান করা কি সুন্নত?
হ্যাঁ, ডান হাতে পান করা সুন্নত ও উত্তম আদব। অভ্যাস করলে এটা সহজ হয়ে যায়।
৪) বসে পানি পান করা কেন সুন্নত বলা হয়?
বসে পান করলে শান্তভাবে পান করা যায় এবং আদব বজায় থাকে। বহু বর্ণনায় বসে পান করাকে উত্তম বলা হয়েছে।
৫) দাঁড়িয়ে পানি পান করা কি হারাম?
সাধারণভাবে বসে পান করাই উত্তম, তবে কিছু অবস্থায় দাঁড়িয়ে পান করার ঘটনাও বর্ণিত আছে। তাই একে সব সময় হারাম বলে ভাবার দরকার নেই।
৬) তিন শ্বাসে পানি পান করার মানে কী?
একবারে না খেয়ে ধীরে ধীরে পান করা, মাঝে গ্লাস নামিয়ে শ্বাস নেওয়া। এতে অস্বস্তি কম হয়।
৭) গ্লাসে শ্বাস ফেলা বা ফুঁ দেওয়া কেন ঠিক না?
এতে পানিতে থুথুর কণা বা জীবাণু মিশতে পারে। শালীনতা ও স্বাস্থ্য দুই দিক থেকেই এটা ভালো নয়।
৮) পানি পান করার পর কী বলা সুন্নত?
“আলহামদুলিল্লাহ” বলা সুন্নত। এটা কৃতজ্ঞতার সুন্দর অভ্যাস তৈরি করে।
৯) বোতলের মুখে মুখ লাগিয়ে পানি খাওয়া কি ঠিক?
একাই হলে সমস্যা কম, কিন্তু শেয়ার করলে অন্যের জন্য অস্বস্তিকর ও অস্বাস্থ্যকর হতে পারে। গ্লাসে ঢেলে পান করা ভালো।
১০) সুন্নতগুলো মানতে ভুল হলে কি গুনাহ হয়?
সুন্নত ছুটে গেলে সাধারণভাবে গুনাহ হয় না, তবে সাওয়াবের সুযোগ কমে যায়। চেষ্টা করে অভ্যাস বানানোই আসল কথা।
উপসংহার
পানি পান করার সুন্নতগুলো আসলে খুব সহজ বিসমিল্লাহ বলে শুরু করা, ডান হাতে ধরা, বসে ধীরে তিন শ্বাসে পান করা, পাত্রে শ্বাস বা ফুঁ না দেওয়া, আর শেষে আলহামদুলিল্লাহ বলা এগুলোই মূল শিক্ষা। এগুলো মানলে শুধু আদবই বজায় থাকে না, স্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নতার দিক থেকেও লাভ হয়।
আপনি চাইলে আজ থেকেই ছোট করে শুরু করতে পারেন পরেরবার পানি হাতে নিলেই শুধু “বিসমিল্লাহ” আর শেষে “আলহামদুলিল্লাহ” বলুন। ধীরে ধীরে বাকি সুন্নতগুলোও অভ্যাস হয়ে যাবে, আর দৈনন্দিন একটা সাধারণ কাজও ইবাদতের মতো সুন্দর হয়ে উঠবে।

Industrial Water Plant




